IAB

“স্থাপত্য ও দর্পণে স্থপতি” শীর্ষক সেমিনার সিরিজের ৩য় পর্ব অনুষ্ঠিত

স্থাপত্যের সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক, স্থাপত্যচর্চার অন্তর্নিহিত চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও ভাবনার আদান-প্রদানকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে গত ৩০ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যা ৬:৩০টা থেকে ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (বাস্থই)-এর মাল্টিপারপাস হলে অনুষ্ঠিত হয় “স্থাপত্য ও দর্পণে স্থপতি” শীর্ষক সেমিনার সিরিজের ৩য় পর্ব ।
যার আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট স্থপতি ও শিক্ষাবিদ স্থপতি অধ্যাপক মো. খায়রুল এনাম।
বাংলাদেশের স্থাপত্য শিক্ষা ও স্থাপত্যচর্চার ইতিহাসে অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল এনাম স্যার একটি সুপরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শিক্ষক, স্থপতি ও গবেষক হিসেবে তাঁর অসামান্য নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি দেশের স্থাপত্য অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। বর্তমানে তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (DIU)-এর স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সাবেক শিক্ষক। অনুষ্ঠানে মোট প্রায় ২১০ জন স্থপতি অংশগ্রহণ করেন। দেশের বহু সিনিয়র স্থপতির উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।
দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণ ও নকশায় ড. মো. খায়রুল এনাম স্যার এর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তাঁর নকশাকৃত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—ফুলবাড়িয়া, ঢাকার Police Head Office Building (১৯৮৮–৯২); জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে Biman Head Office Building (Bolaka) (১৯৯৩–৯৫); Railway Head Office Building (১৯৮৮–৯১); কারওয়ান বাজারে Steel and Engineering Corporation-এর Head Office Building (১৯৭৭–৮০); সহ আরো বহুবিধ কাজ। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিসরেও তাঁর স্থাপত্যকর্ম স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে International Architectural Design Award এবং Fael Khair Award for School-cum-Cyclone Shelter, 2010 উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি অসংখ্য শিক্ষার্থী ও তরুণ স্থপতির কাছে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল চিন্তার অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছেন।
এই সেমিনারে, অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল এনাম তাঁর “My Architecture Journey: The Searching Space for a Purpose and Inspiration” শীর্ষক উপস্থাপনার মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ স্থাপত্যযাত্রার বিভিন্ন অধ্যায় তুলে ধরেন।
উপস্থাপনায় তিনি তাঁর স্থাপত্য শিক্ষা ও থিসিসের অভিজ্ঞতা, থিসিস প্রকল্প এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নকশা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তাঁর দীর্ঘ পেশাজীবনে দেশ-বিদেশে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য প্রকল্প, প্রাতিষ্ঠানিক ভবন, আবাসিক স্থাপনা, মাস্টারপ্ল্যান এবং প্রতিযোগিতামূলক নকশায় তিনি কাজ করেছেন।দেশের গণ্ডি পেরিয়েও তাঁর স্থাপত্যচর্চার বিস্তার ঘটেছে- Nangarhar University, Afghanistan (with BCL, ২০০৯) এবং Balkh University, Afghanistan (with BCL)-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রকল্পেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
এই দীর্ঘ কর্মযাত্রায় তিনি শুধু ভবন নকশা করেননি; বরং শিক্ষা, প্রশাসন, গবেষণা, আবাসন, পরিবহন, দুর্যোগ-সহনশীলতা এবং নগর পরিকল্পনাসহ স্থাপত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীল চিন্তার ছাপ রেখেছেন। প্রকল্পের ধরন, সময়কাল ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সঙ্গে স্থাপত্যচিন্তার বিবর্তনকে ধারণ করে প্রায় ছয় দশকের এই বিস্তৃত অভিজ্ঞতা তিনি তাঁর উপস্থাপনার মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরেন।
তাঁর কর্ম, দর্শন, অনুসন্ধিৎসা ও সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনা উপস্থিত স্থপতি, শিক্ষক ও তরুণ প্রজন্মের জন্য হয়ে ওঠে এক অনন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
এরপর সেমিনারের প্রশ্নোত্তর পর্বটি মডারেটর হিসেবে পরিচালনা করেন স্থপতি নায়না তাবাসসুম। এ পর্বে অংশগ্রহণকারী স্থপতিরা স্থপতি প্রফেসর ড. খায়রুল এনাম স্যারের দীর্ঘ স্থাপত্যচর্চা, বিভিন্ন প্রকল্প, নকশা-দর্শন, গবেষণা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে নানা প্রশ্ন করেন। মডারেটরের সঞ্চালনায় প্রাণবন্ত এই প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তা তাঁর অভিজ্ঞতা, স্থাপত্যভাবনা ও পেশাজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত মতামত প্রদান করেন। এতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য তাঁর দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ স্থাপত্যযাত্রাকে আরও গভীরভাবে অনুধাবনের সুযোগ তৈরি হয়
সার্বিকভাবে, “স্থাপত্য ও দর্পণে স্থপতি” সেমিনার সিরিজটি পেশাগত আত্মপ্রতিফলন, প্রজন্মের মধ্যে সংলাপ এবং স্থাপত্যচর্চার মানবিক দর্শন পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সেমিনারের শেষপর্বে স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির সম্মানিত অতিথির হাতে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।
সেমিনারটির সার্বিক পরিচালনায় ছিলেন বাস্থই-এর ২৬তম নির্বাহী পরিষদের সম্পাদক (সেমিনার ও কনভেনশন) স্থপতি সাইদা আক্তার মুমু এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন স্থপতি সুনীলা বিনতে আহসান । সেমিনারের শেষভাগে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (IAB)-এর ২৬তম নির্বাহী পরিষদের সম্পাদক (পেশা) স্থপতি এম. ওয়াহিদ আসিফ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
এই অনুপ্রেরণামূলক সেমিনারের আয়োজনে সহযোগিতা করার জন্য Asian Paints Bangladesh-কে আন্তরিক ধন্যবাদ।
Scroll to Top