কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন—এক অনন্য সৃজনশীল সত্তা, যাঁর জীবন ও শিল্পচর্চা আমাদের স্থাপত্য ও সাহিত্যচিন্তাকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ স্থপতি ইন্স্টিটিউট (বাস্থই) ও বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যৌথ উদ্যোগে ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সোমবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে এক মনোজ্ঞ আয়োজনের মাধ্যমে কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন-এর জীবন ও শিল্পচর্চা বিষয়ক প্রদর্শনী ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়।
স্থপতি ইন্স্টিটিউট-এর পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ডঃ মাসুদ রশিদ এর আহবানে সাবেক সভাপতি, কাজী গোলাম নাসির এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সম্মানিত ট্রাস্টি জনাব মফিদুল হক অনুষ্ঠানটির শুভ সূচনা ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম, সদস্য, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই) নবীন স্থপতি এবং স্থাপত্যর ছাত্রদের পুরো জাদুঘরটি ঘুরিয়ে দেখান এবং জাদুঘর ডিজাইন থেকে শুরু করে নির্মাণ সময়ের নানান অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
সূচনা সংগীত পরিবেশন করেন ড. লাইসা আহমদ লিসা, সাধারণ সম্পাদক, ছায়ানট। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থাপত্যিক ভাবনা, নকশা এবং রবিউল হুসেইনের অবদান নিয়ে আলোকপাত করেন স্থপতি তানজিম হাসান সেলিম। তিনি উল্লেখ করেন তরুণ স্থপতি হিসেবে নানান প্রতিকুল পরিস্থিতিতে কিভাবে রবিউল হুসেইন সাহস এবং অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন…তিনি বলতেন… “Every problem is a solution in disguise” . …..” চা এর কাপে গরম চা ঢাললে কিন্তু কাপ ফেটে যায়” অতএব সহনশীল হতে হবে।

রবিউল হুসাইন সবসময় ছিলেন নতুন নতুন চমকপ্রদ ধারনার এক অফুরন্ত উৎস। তাই স্থপতি কাজী এম. আরিফ, সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং স্থপতি তামান্না রহমান সকলের প্রিয় রবিদা’কে স্মরন করেন দ্বৈত কবিতা পাঠ ও নৃত্যাভিনয় এর মাধ্যমে।
সমাজের নানা পেশার, নানা ধরনের মানুষের সাথে রবিউল হুসাইনের ছিল অবাধ যোগাযোগ। তাঁকে জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল—তাঁর সঙ্গে কাজ করা, তাঁর পাশে দাঁড়ানো, এবং তাঁর চিন্তার সহযাত্রী হওয়া। ইঞ্জিনিয়ার খুরশেদ বাহার এর বক্তব্যে ফুটে উঠে তাঁর কাজের প্রতি নিষ্ঠা, একাগ্রতা এবং সহমর্মিতা।
সামগ্রিকভাবে কবি রবিউল হুসাইনের কবিতাচর্চা বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছে।
তাঁর কবিতায় ছিল গঠন ও সংযম, আবার ছিল প্রতিবাদ ও মানবিক বোধের তীব্রতা। এই সাহিত্যিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অর্জন করেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার— এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
কবিতা ও সাহিত্যে অনবদ্য অবদানের জন্য ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, তাঁর স্বতন্ত্র কবিতাভাষা ও চিন্তার স্বীকৃতিতে ২০১১ সালে কবিতালাপ সাহিত্য পুরস্কার, কবি হিসেবে তাঁর অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করে ২০১২ সালে জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার, এবং সর্বোপরি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর সামগ্রিক অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালে একুশে পদক অর্জন। এই পুরস্কারগুলো কেবল সম্মান নয়—এগুলো সাক্ষ্য দেয় রবিউল হুসাইনের কবিতা কীভাবে ব্যক্তি থেকে সমাজে, সময় থেকে ইতিহাসে পৌঁছে গেছে।

কিন্তু তিনি নিজে কখনো কবিতা আবৃত্তি করতে চাইতেন না। এক সময় ‘শেকড়ের টানে’, বটতলার নিচে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নিজ কণ্ঠে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। সেই ভিডিও চিত্র দেখার পরপরই, তাঁর দুটি কবিতা যেন আরেকবার জীবন্ত হয়ে উঠে স্থপতি রাফি উদ্দিন মাহমুদ এর বলিষ্ঠ কণ্ঠে।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রবিউল হুসাইন এর ছায়া বিরাজমান। স্থপতি ফারহানা শারমিন ইমুর কাছে তিনি পিতৃস্থানীয়। তার সৌভাগ্য হয়েছিল রবিউল হুসাইনের সান্নিধ্যে থাকার, তাঁকে কাছ থেকে জানার। একবার তিনি এই বটতলার অনুষ্ঠানে অনুরোধ করেছিলেন লালন সঙ্গীত “আমি অপার হয়ে বসে আছি ওহে দয়াময়….পাড়ে লয়ে যাও আমায়”….স্থপতি ইমু শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন গানে গানে।
রবিউল হুসাইন ছিলেন এমন একজন স্থপতি, যাঁর কাছে স্থাপত্য কখনোই কেবল পেশা ছিল না—
এটি ছিল সমাজের প্রতি দায়িত্ব, ইতিহাসের প্রতি সচেতনতা এবং মানুষের প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতি। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নকশা করেছেন, লিখেছেন, ভেবেছেন—কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি স্থাপত্যকে যুক্ত করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে।

এই দীর্ঘ ও নিবেদিত পেশাগত পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি আসে
২০১৬ সালে, যখন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট তাঁকে প্রদান করে তাদের সর্বোচ্চ সম্মান— IAB Gold Medal। এ উপলক্ষে একটি ভিডিও ডকুমেন্টারিতে তুলে ধরা হয় তাঁর বাংলাদেশে স্থাপত্য পেশাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা, স্থপতিদের অধিকার ও দায়িত্বের প্রশ্নে সোচ্চার ভূমিকা, তরুণ স্থপতিদের চিন্তা ও নৈতিকতায় প্রভাব রাখা, এবং স্থাপত্যকে সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরার দীর্ঘ সংগ্রাম।
রবিউল হুসাইনকে স্মরণ করতে গেলে তাঁর দীর্ঘ সহযাত্রীদের কণ্ঠ অন্যরকম এক সত্য নিয়ে আসে—
যেখানে স্মৃতি কেবল আবেগ নয়, তা হয়ে ওঠে সময়ের সাক্ষ্য। বাস্থই-এর সাবেক সভাপতি ও সম্মানিত ফেলো কাজী গোলাম নাসির দীর্ঘদিন স্থাপত্যচর্চা, সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক পথচলায় যুক্ত ছিলেন—রবিদা’র সাথে। তিনি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কেবল অতীতকে সংরক্ষণ করে না—এটি আমাদের বর্তমানকে প্রশ্ন করে
এবং ভবিষ্যতের প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখায়। এই চেতনাকে সংরক্ষণ ও প্রজন্মের পর প্রজন্মে পৌঁছে দেওয়ার যে নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস, তার অন্যতম প্রতীক হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সম্মানিত ট্রাস্টি, মফিদুল হক এর সাথে স্থপতি রবিউল হুসাইন-এর এক দীর্ঘ পথচলা। সংক্ষিপ্ত আকারে তিনি তুলে ধরেন কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর-এর একজন বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্য—হিসেবে তাঁর স্থাপত্যবোধ, সাহিত্যচেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ কিভাবে একই সূত্রে মিলিত হয়েছে।
পরিশেষে স্থপতি ও কবি রবিউল হুসাইনকে নতুন করে অনুভব করার এই গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের সংশ্লিষ্ট সকলকে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই) এর সভাপতি ড. আবু সাঈদ এম. আহমেদ আন্তরিক ধন্যবাদ প্রদান করেন এবং রবিউল হুসাইন সংগৃহীত লেখার একটি সংকলন প্রকাশের আশা ব্যক্ত করেন।
